উরুগুয়ের ছেলে মাতিয়াসের সাথে পরিচয় হয়ছিল বার্সেলোনার হোস্টেলে। ২০২৩ এর এপ্রিল মাসে।
বার্সেলোনায় আমার হোস্টেল ছিল ফাইভ স্টার টাইপ, আর খুব হ্যাপেনিং। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় এক ঘণ্টার সালসা নাচের ক্লাস হয়, সালাসার এবিসিডি শেখানো হয়। ফান আর কি! সাত-আটজনের সাথে আমাকেও জোর করে ক্লাসে নিয়ে গেছে ফিলিপা, আমাদের ড্যান্স টিচার। সেখানে পরিচয় মাতিয়াসের সাথে। খুব হাসিখুশি ছেলে, হোস্টেলে যতো বার দেখা হয়, ব্রেস পরা দাঁত বের করে বিরাট একটা হাসি দেয়।
সেদিন সারাদিন বার্সেলোনার কোণায় কোণায় ছাপ্পা মেরে হোস্টেলে ফিরে ভেবেছি ১২টার মধ্যে ঘুমায় যাবো। হেভি একটা ঘুম দিয়ে সকালে আরামে এয়ারপোর্ট যাবো। শুতে যাবার আগে লবিতে বসে সানজিদার সাথে কথা বলছিলাম। সে পর্তুগাল থেকে কল দিয়েছে। আমি কবে যাবো, কোথায় থাকবো, ওর সাথে কবে দেখা হবে, এই সব দরকারি কথাবার্তা হলো। এর মধ্যে মাতিয়াস ব্যাগ-বোচকা নিয়ে আকর্ণ বিকশিত হাসি দিয়ে পাশে এসে বসলো। সানজিদার সাথে কথা শেষ করে মাতিয়াসরে বললাম, কই যাও? সে বললো, ভোরে তার প্যারিসের ফ্লাইট। তিনটায় বের হবে হোস্টেল থেকে, এখন আর ঘুমাবে না।
সে ইংরেজির অআইঈটুকুও জানে না। আমরা মহাআনন্দে গুগল ট্রান্সলেটরে কথা বলে গেলাম। ট্রান্সলেটর দিয়ে কথা বলি আর একটু হাসতে হাসতে সোফা থেকে পড়ে যাই, মাঝে মাঝে এই অবস্থা হয়। হোস্টেলের স্টাফ এসে আস্তে করে হাসতে বলে গেলো দুইবার।
প্রেম, ভালোবাসা, স্বপ্ন, লক্ষ্য, জন্ম, মৃত্যু, জীবন বোধ, জীবন দর্শন -- নানা বিষয়ে কথা হলো। ওকে এয়ারপোর্টের জন্য বিদায় দিয়ে আমি পৌণে তিনটায় ঘুমাতে গেলাম।
মাতিয়াসের জন্ম এক দরিদ্র, গোঁড়া ক্যাথলিক ফ্যামিলিতে। সে গে। কৈশোরে সে তার সেক্স্যুয়াল আইডেন্টি বুঝতে পারে। ফ্যামিলি এটা নিয়ে ঝামেলা করলে সে বাড়ি ছেড়ে চলে যায়। অনেক কষ্টে পড়ালেখা চালিয়েছে। নিজের পায়ে দাঁড়িয়েছে। ব্যাংকে চাকরি করে। ফ্যামিলি গোঁড়া হলেও একসময় তাকে বুঝতে পেরেছে, তার গে আইডেন্টিটিসহই ফ্যামিলি তাকে ফিরিয়ে নিয়েছে।
সম্প্রতি তার বয়ফ্রেন্ডের সাথে ব্রেক আপ হয়েছে। ওহ, তার এক্স-বয় ফ্রেন্ড আবার লইয়ার। ওদের সম্পর্কটা টক্সিক হয়ে গেছিল, তাই সে বেরিয়ে আসতে বাধ্য হয়েছে। মন খারাপ করে তার প্রেম, বিচ্ছেদের গল্প শোনাল।
আমি বাংলাদেশী, মাতিয়াস উরুগুয়ের। গ্লোবের একবারে দুই প্রান্তে দুইজনের বসবাস। সে স্প্যানিশ বলে, আমি বাংলা। বয়সে সে আমার অর্ধেকের কাছাকাছি প্রায়। আমার জন্ম মধ্যবিত্ত, প্রগতিশীল মুসলিম ফ্যামিলিতে, তার জন্ম দরিদ্র, গোড়া ক্যাথলিক ফ্যামিলিতে। আমি স্ট্রেইট, সে গে। আমাদের লাইফ স্টাইলেও হাজার পার্থক্য আছে। কিন্তু, মাতিয়াসের সাথে কথা বলার সময় মনে হচ্ছিল, আমি আয়নার সামনে কথা বলছি। দুইজনের চিন্তা ভাবনা, জীবনদর্শনে প্রচুর মিল।
ট্রাভেলিংএ আমরা ক্রমাগত শিখতে থাকি, লাইফ লেসন। এবার মাতিয়াস আমার জন্য একটা বিরাট অভিজ্ঞতা। ভাষা, ধর্ম, ভূগোল, বয়স ইত্যাদি বাহ্যিক পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও দুজন মানুষের অন্তর্গত চিন্তার জগৎ কী অদ্ভুত ভাবে মিলে যেতে পারে, মাতিয়াসের সাথে পরিচয় না হলে, কথা না হলে, জানতাম না।
জীবনের বাঁকে বাঁকে কতো বিস্ময়কর অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হই আমরা!
জয়তু জীবন, জয়তু ট্রাভেলিং।